ত্রিদিব-অংকুর’র সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ ও কান্নার বিদায়

0 7

ত্রিদিব হালদার একজন ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। একজন ভালো ফুটবলারও ছিলেন। সময় পেলেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশ বিদেশ। তার এই সব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি তার সুন্দর লেখনির মাধ্যমে ভ্রমণ পিপাসু পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরছে ব্রেকিং২৪.নিউজ। ত্রিদিব-অংকুরের ইতালির মিলান শহরে পরিবারের মিলন মেলার আজ শেষ কিস্তি।

পড়তে থাকুন আরো আসছে….

আমরা যখন বিকেলে সময় পেয়েছিলাম সুন্দর কিছু জায়গায় গিয়েছিলাম বারগামোতে যার মধ্যে একটির কথা না বললেই নয়। লিওনার্দ দা ভিঞ্চির একটি ডিজাইনে ফেরি বানানো আছে ছোট একটি পার্কে ওখানে লেকের এ পার হতে ও পারে লোক পারাপারের জন্য শুধু মাত্র একটি লোহার দড়ি বাঁধা আছে এবং তার মধ্যে ছোট ফেরিটি লাগানো, আশ্চর্য!! শুধু বাতাসে এপার থেকে ওপারে অটোমেটিক চলে যাচ্ছে এবং মানুষ গুলোও নির্দ্বিধায় লেকটি পারাপার হচ্ছে। দেখে এত ভাল লাগলো, খুবই সিম্পল কিন্তু এতটা কাজের যেটা না দেখলে বোঝা যাবে না।

ইতালির বারগামোতে গাছে ঝুলন্ত লাইব্রেরী

ঐ পার্কে আরেকটি ভাল লাগার ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, একটি ছোট লাইব্রেরী। একটি গাছের গোড়ায় বক্স করে আঁটানো আছে বেশ কিছু বই।এটা হলো কেউ যদি কোন বই কিনে পড়ে ফেলে, ওটা পরবর্তিতে এই বক্সের মধ্যে রেখে যেতে পারে। যাদের এখান থেকে পড়তে ইচ্ছে করবে ওটা নিয়ে যেতে পারবে, আবার পড়া শেষ হলে ওখানেই আবার রেখে দিবে। এভাবে চক্রাকারে বই গুলো থাকে ওখানে।

গাড়ীতে বসেই ভাবছিলাম মানুষ গুলো কত সৎ এখানে, কোন বই চুরি হওয়ার বালাই নাই। যার যেটা দরকার সে সেই বইটা নিয়ে যাচ্ছে আবার পড়া শেষ হলে ঠিক মত ফেরৎ ও দিচ্ছে, ভাবা যায়!!

পাহাড়ে বসতি।

খুব সকালেই রওনা দিয়েছিলাম সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে, বড় বৌদি চটপট করে সবার জন্য নাস্তা করে ওখানে কি খাবো তারও প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছিলেন।

ইউরোপের গাড়ী গুলোর নাম্বার চেনার একটি সহজ উপায় হলো প্রথম অক্ষর গুলো যে যে দেশের সেই আলফাবিট টাই হয় তার পর নাম্বার বসে। যেমন ফ্রান্সের রেজিস্ট্রিকৃত গাড়ী হলে প্রথমে ‘এফ’ হবে পরে নাম্বার বসবে। তেমনি ইতালীর গাড়ীর নাম্বার প্রথমে ‘আই’ পরে নাম্বার। আমরা যখন সুইজারল্যান্ডের বর্ডারে ঢুকবো তখন আসলে বুঝার কোন উপায়ই ছিলনা আমরা বর্ডার ক্রস করছি। শুধু মাত্র দুটি পুলিশ দেখলাম আমাদের গাড়ীর নাম্বারটি দেখলো। আগেই দাদা বলে নিয়েছিলেন পাসপোর্ট নিয়ে যাওয়ার জন্য, নর্মালী অন্য দেশের গাড়ী দেখলে ভিজিটর দের কাগজ পত্র চেক্ করে। কিন্তু আমাদের করেনি।

ছোট বেলা থেকেই জেনে এসেছি পৃথিবীর স্বর্গ বলা হয় সুইজারল্যান্ডকে। অনেক ছবি দেখেছি, অনেক গল্প শুনেছি, এবার নিজের চোখে দেখবো। এ যে কি প্রশান্তির!! আমার জীবনের আরেকটি স্বপ্ন পূরণ হতে চললো।

সুইজারল্যান্ডের নৈস্বর্গিক দৃশ্য।

এক পাশে বড় পাহাড় মাঝে ঝক্ ঝকে টক্ টকে স্বচ্ছ পানি টলমল করছে, ছোট ছোট স্পীডবোর্ড, নৌকা গুলো যাচ্ছে সাথে, কিছু রাজহাঁস পানিতে ভাসছে, পাশেই মেট্রোরেল লাইনে রেল যাচ্ছে আর আমরা পাশেই স্মুদ রাস্তা দিয়ে এক শত বিশ কিলো বেগে গাড়ী নিয়ে যাচ্ছি। পাহাড়ের মাঝখানে ছোট ছোট গুছানো বাড়ী। মনে হচ্ছে এ যেন ছবি দেখছি।

প্রায় এক শত কিলোমিটার গাড়ী যাওয়ার পর লুগানো শহরে ঢুকলাম। গাড়ী পার্ক করে একটি বিয়ার খুলে খাচ্ছি ও পথে হেঁটে যাচ্ছি সবাই। এ যেন মনে হলো নিজের শহরে হাঁটছি সবাই। ঐদিন ছিল ব্রাজিল ও সুইসদের বিশ্ব কাপ ফুটবল খেলা। এই প্রথম কাউকে দেখলাম ফুটবল নিয়ে একটু মাতামাতি করার, ব্রাজিলীয়ান সাপোর্টারস হওয়ায় নিজেও একটু ওদের সাথে হৈ চৈ করলাম। এবার বিয়ার এর কৌটা ফেলার জন্য নিজে থেকেই ডাস্টবিন খুঁজছি। বড় দাদা বলে উঠলেন দেখ্ এটাই হলো পার্থক্য এখানে তুই নিজেই বিন্ খুজছিস্। আসলেই তাই, এত ঝক্ ঝকে তক্ তকে সব রাস্তাঘাট যেন কিছু পড়লেই নষ্ট হয়ে যাবে তাই বিনে ময়লা ফেলার অভ্যাসটা নিজে থেকেই আসে।

এত ছবি তুলছি তাও যেন মন ভরে না, কোনটা রেখে কোনটা তুলবো। যাহোক, পার্কে হাঁটছি আমি ও আমার মেঝ দাদা, এক ভদ্রলোক আমাদের দেখেই বলছে আর ইউ ফ্রম বাংলাবেশ ? আমি একটু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম ‘ইয়েছ’ বাট হাউ ডু ইউ গেছ উই আর ফর্ম বাংলাদেশ ? উনি যা রিপ্লাই দিলেন একটু অবাকই হয়েছিলাম। বললেন উনি নাকি অনেক বার বাংলাদেশে এসেছেন। বেশ কিছু জায়গার নাম ও বললেন আবার আমাদের আতিথিয়তার প্রশংসা ও করলেন। তবে একটু রাগ হচ্ছিল যখন বাংলাদেশী মেয়েদের কথা একটু অন্যভাবে বিশ্লেষন করতে চেয়েছিলেন, বুঝলাম উনি একটু বেশী মাত্রায় এ্যালকোহল খেয়েছেন। তারপরও একটি ব্যাপার অনেক ভাল লেগেছে যেটা আগের লেখায় ও বর্ণনা করেছিলাম যে বাংলাদেশী বলে তাচ্ছিলের ভাবটা এবার একটুও টের পাইনি।

তিন ভাই, লুগানো, সুইজারল্যান্ড পার্কে।

সারাদিন হাঁটাহাঁটির পর একটু ক্লান্ত হওয়ার কথা থাকলেও ক্লান্তি যেন ভয়ে পালাচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। আসলে এত সুন্দর, এত্ত সুন্দর, যেন যা দেখি সবই অন্য রকম একটি আকর্ষণ ফিল্ করি। খাওয়া দাওয়া শেষ করে আবার রওনা হলাম ইতালির উদ্দেশ্য।

এ যাত্রায় এই বুঝি শেষ হয়ে গেল, তাই পরের দিন ঢাকার ফ্লাইট জেনেও তিন ভাইয়ের রাতের আড্ডা যেন শেষই হয় না।

যখন এয়ারপোর্টে ভাইরা ও বৌদি বিদায় দিতে এলো মনে হলো কি যেন একটা হারিয়ে ফেলছি। বুকে একটা শুন্যতা, লাগেজ গুলো বুকিং এ দিয়ে সবাই হাঁটছি কারো কোন কথা নেই। একটা পয়েন্ট পর্যন্ত সবাই যাওয়ার পর সিকিউরিটি বললো এবার শুধু আমরা দুজন এলাউড। বুকটা ছিড়ে যাচ্ছিল, মেঝো ভাই কে বুকে জড়িয়ে ধরলাম ও কোন কথা বলতে পারলো না, এর পর বড় ভাই কে বুকে জড়াতেই ভাঙ্গা কন্ঠে বললো ভাল ভাবে যাস্, তারপর চোখ মুছছে। বৌদি চোখের জল আর আটকাতে পারলো না যখন আমাকে জড়িয়ে ধরলো। বড্ড আদরের আমি সবার কাছে, মনে হচ্ছিল ওরা অনুমতি পেলে আমাদের প্লেনে বসিয়ে দিয়ে আসতো কিন্তু তা আর হলো না।

আমার চোখের জ্বলের আবরনটা এবার বুঝি গালেতেই চলে এসেছে আর পিছনে তাকালাম না সিকিউরিটি চেকিং এ ঢুকে অংকুকের কান্না থামালাম।

লেখা ও ছবিঃ ত্রিদিব হালদার।