শ্রীমঙ্গল ও হাম হাম ঝরনার অপরূপ স্মৃতি

0 10

বারবারই মনে হয়েছে এ যাত্রায় সঙ্গী না হলে কি হয় ! পকেটের অবস্থা এমনিতেই বারটা তার উপর আবার ভ্রমন !! কিন্তু কিছুতেই মন কে মানাতে পারছি না, যা হয় হবে জীবনতো একটাই। অতৃপ্তিটা পূরণ না করে পরিপূর্ণ জীবন যে উপভোগ্য হয় না।

ইফতেখার, নাজমুল, ফজলে ও আমার বউ এর কল্যানে ট্রেনের টিকেট পেতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। এবারের লোক সংখ্যা ছোট বড় মিলিয়ে পয়ঁত্রিশ জন। সিদ্ধান্ত হল প্রথমে শ্রীমঙ্গল যাব, ওখানে এক রাত থেকে পরের দিন হাম হাম ঝরনা দেখবো। সত্যি বলতে কি, আমার এ ঝরনার ব্যাপারে আদ্যপান্ত একদমই অজানা ছিল। কিন্তু সবার এমন উদ্যমতা ও আমার বউ এর সার্বিক ফলোআপ দেখে আমি যেন আরো উৎসাহী হয়ে পড়লাম এবং এটাকে আরো প্রাণবন্ত করে তুললো পূর্বের রাতে আমাদের বাসায় লামিয়া, তন্নি ও মেহজাবিন এর থাকাটা। সাথে সওকত ও শাকীলা ভাবীর হঠাৎ সফিক কে নিয়ে রাত এগারোটার দিকে আগমন শুধু প্রিপারেসন কেমন তা জানার জন্য, এটা এক অভূতপূর্ব আনন্দের জন্ম দিয়েছে।

এত সকালেও এয়ারপোর্ট রেল স্টেশনে এত লোকের সমাগম দেখে কিছুটা বিষ্মিত হয়েছি। সাধারণত ঈদের আগে এ ধরনের ভিড় দেখা যায়। অবশ্য তেমন কোন সমস্যা হয়নি দল একটু বড় হওয়াতে। সুবিধা যেমন একটু বেশি মাত্রায়ই আমাদের দিকে ছিল। পুরো বগিতে আমরা পয়ত্রিশ জন, ভাবা যায় !! ট্রেন চলছে তো চলছে আর রাব্বি, ফজলের অসাধারন গিটারে তোলা গান সাথে আমাদের গুনগুন করে সুর মেলানো, আবার যুক্ত হলো বউয়ের মিষ্টি হিন্দী রিমিক্স, এর থেকে আনন্দের আর কি হতে পারে। আবার তৌহিদের হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ওঠার মত ছবির বিকট চিৎকারের স্কেল না মেলানো গান যেন হাসির বন্যায় ভাসছি সবাই। কখন যে চার ঘন্টা এভাবে চলে গেল টের পাইনি।

শ্রীমঙ্গল স্টেশন থেকে নেমে আমাদের হোটেল পনেরো থেকে বিশ মিনিটের পথ। গেটে ঢুকেই মনে হলো আমি কি বাংলাদেশে আছি না অন্য কোন উন্নত দেশে আছি!! এত সুন্দর নির্মল স্নিগ্ধ দৃশ্য এতো মনুষ্য সৃষ্ট, তবে কেন পুরো দেশটা নয়!!!! এত গোছানো যে নিজে না দেখলে বোঝানোর ভাষা আমার যানা নেই। স্নিগ্ধ সবুজ শান্ত মনোরম প্রকৃতি সাথে রূপ দিয়েছে কিছু পরিচ্ছন্ন কর্মী, কাজ করছে শুধু সৌন্দর্য্য ধরে রাখার জন্য। এ যেন দৃষ্টি নন্দিত এক উপভোগ্য প্রকৃতি।

শ্রীমঙ্গল হোটেলের সুইমিংপুল এ ডাইভ।

সুইমিং পুল এ নামার আগে অনেক প্রশ্নের সন্মুখীন হয়েছি আমি, ফজলে ও মারুফ। আমাদের সর্টস্ কি জার্সীর কিনা, নাকি কটন পলিস্টার মিক্সড, নাকি পুরোটাই কটন ইত্যাদি, ইত্যাদি। সবকিছু ঠিক আছে আমাদের, আর তো ধৈর্য্য ধরা যাচ্ছে না!! পানির সামনে গিয়েই ডাইভ, আর কে আটকায়। ধুৎ, যা হয় হবে। না, ওরা বরঞ্চ বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতাই করলো শেষে। দুপুর টা আমার, মরুফ ও ফজলের মধুর এক আড্ডায় গড়িয়ে বিকেল হতেই বেরিয়ে পরলাম পুরো জায়গাটা দেখার। সত্যি, মানুষের শুধু টাকা থাকলেই হয় না রুচিশীল একটি টেস্ট ও থাকা দরকার যা আমরা টের পেয়েছি হোটেলের স্থাপনা, কারুকাজ ও পরিচর্চা দেখে।

ডিনার শেষে রাব্বি ও ফজলের অসাধারন গানের আসরে বসেছি খোলা কিডস্ জোনে। সাথে রাসেদ এর অফুরন্ত গানের ঢালি আসরকে অন্য মাত্রায় ছুঁয়েছে। আমি কিছুটা বেসুরো গলায় কারাওকি দিয়ে কয়েকটা গান চেষ্টা করেছি। তবে দর্শকের আনন্দ দেখে নিজেকে উজাড় করে দিতে ইচ্ছে হয়েছে, তাই ‘চাঁদ তারা’ গানটি বসা থেকে দাড়িয়ে চিৎকার করে গেয়েছি সাথে রাব্বির মন ছোঁয়ান গিটার তো বাজছেই। দারুণ এক অনুভুতি। নাহ্, আফসোস ইফতেখার এর ‘আলাল ও দুলাল’ গানটা গাওয়া হলো না!!! অনেক দিন পর খোলা মাঠে এমন এক অপরুপ আসর পেয়েছি, একি ভোলা যায় কখনো ?

আসর শেষে কার্ড খেলার এক কথায় আমি, ফজলে, রাব্বি ও ইফতেখার রাজী হয়েছি। মারুফ ঘুমাচ্ছে এদিকে আমরা খেলছি। ইফতেখার এর খামখেয়ালীর জন্য বার বার কল পয়েও নিয়ম অনুযায়ী সর্ট কলের আওতায় আসায় হাসির রোল যেন নীচ অব্দি শোনা যাচ্ছিল। মনে হলো এ খেলা কিছুতেই শেষ হওয়ার নয় কিন্তু সকাল সকাল ট্রেকিং এর উদ্দেশ্যে না বেরুলে একি দিনে ফেরা টা যে কঠিন হয়ে পড়বে। সতরাং ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘুমাতে হবে, সকাল সাতটায় হাম হাম এর উদ্দেশ্যে রওনা দিব।

এত বড় দল নিয়ে ওখানে যাওয়াটা মোটেই ঠিক হবে না তাই সিধান্ত হলো ছোট গ্রুপে যাব। ঠিক করলাম আমি, আমার বউ, ফজলে, তৌহিদ, লামিয়া, তন্নি, মেহজাবিন ও মৌ এ ক’জন এবার এই পথ পারি দিব। আমাদের আট জনের আসল উদ্দেশ্য কিন্তু হাম হাম ঝরনা দেখতে যাওয়ার ছিল মাঝে হোটেলটি বারতি পাওনা।

ঝিরি পথ। পথ গুলো ও পাশে সব গুলো পাথরের।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শেষ মাথায় একদম ইন্ডিয়ার বর্ডারের কাছে এ ঝরনার অবস্থান। কলাবনপাড়া, যে টি জঙ্গলে ঢোকার আগের গ্রাম, ওখান থেকে আট কিলোমিটার দূরে এ ঝরনার অবস্থান। দুভাবে যাওয়া যায়, এক, পুরোটা ঝিরি পথ ধরে যেখানে প্রচুর পিচ্ছিল পাথর, জোঁক ও অনেকটা বেশি পথ পেরুতে হয়। আর আরেকটা হলো উঁচু নিচু অনেক পাহাড় (লোকে টিলা বলে) পেরুতে হয় কিন্তু ঝিরি পথ থেকে অনেকটাই সময় কম লাগে। তবে জোঁক, মশা, সাপ, বানর ও বল্লার আক্রমন এ পথে বেশি। স্থানিয় ভাবে এটিকে ‘চিতা ঝরনা’ ও বলা হয়। মানে হলো এখানে চিতা বাঘের ও নাকি আনাগোনা আছে। কেউ কেউ মনে করে হাম হাম শব্দটি ‘হাম্মাম’ মানে হলো গোসল খানা থেকে এসেছে আবার কেউবা বলে সিলেটি ভাষা ‘আম আম’ মানে জোরে শব্দ থেকে এই হাম হাম হয়েছে, সে যা হোক, ২০১০ সালে প্রথম এটি আবিষ্কার হয় কিছু পর্যটকের দ্বারা। বাংলাদেশের সব চেয়ে উঁচু ঝরনা ধরা হয় মাধব কুন্ডের ঝরনাকে যার উচ্চতা ১৬২ ফুট আর এর উচ্চতা না মাপা হলেও ধরা হয় আনুমানিক ১৩০ থেকে ১৬০ ফুট। অনেক আলোচনার পর আমরা বেঁছে নিলাম পাহাড়ি পথটি।

আমাদের বিকেলে ঢাকা ফেরার ট্রেন পাঁচটা পনেরো তে, কিন্তু তার আগে আমার বউ এর বান্ধবী সুপ্তি ও তাঁর স্বামীর বাসায় হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে দেয়ে স্টেশন যাব এমনই প্ল্যান। ওর বাসা থেকে স্টেশন বিশ মিনিটের পথ। তাই আমাদের জন্য ও কষ্ট হলেও রান্না করে রাখবে।

হোটেল থেকে বেরুতে বেরুতে সকাল সাড়ে সাতটা বেজে গেল। জেনেছি মাইক্রোতে এক ঘন্টার পথ হোটেল থেকে কলাবনপাড়া পর্যন্ত। ওখান থেকে পাহাড়ি পথে আট কিলোমিটার হাঁটা পথ।

না, দেড় ঘন্টা লাগলো আমাদের ঐ গ্রামে পৌঁছাতে। গাড়ী রেখে একটি গাইড ও কিছু লাঠি নিয়ে বি ডি আর এ রির্পোট করলাম নয়টা পনেরতে এর পর জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম কিছু মিনি প্যাক সেম্পু নিয়ে।

 

ছোট ছোট চারটি সাঁকো পার হওয়ার পর শুরু হলো উঁচু নিচু পথ। আমাদের গাইড এবার সবাইকে পায়ে খোলা যায়গায় শ্যাম্পু মেখে নিতে বললেন, এটি হলো জোঁকের হাত থেকে সাময়িক বাঁচার উপায়। হাঁটছি তো হাঁটছি। উঁচু টিলা গুলোর পথ এমন খাড়া যে মাঝ পথে একটু না থেমে পারা যায়না। গাছের শিকড় গুলোকে সিড়ির মত করে ব্যাবহার করতে হচ্ছে। হঠাৎ আমার মনে হলো পায়ে মশা কামড়ে ধরে আছে, এমন চুকোচ্ছে!! নিচে হাত দিয়ে মারতেই দেখি এত মশা নয়!! ওরে বাবা জোঁক!!! তিন ভাগের দুই ভাগই আমার পায়ের মাংসে ঢুকে আছে। কোন কথা নেই দুই আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে দিলাম টান। না, ভেতর থেকে বেরুচ্ছে না বরঞ্চ আর ভিতরে ঢুকে গেল। দ্বিতীয় বার আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিয়ে জোরালো ভাবে টান দিলাম, কাজ হলো। সবাই একটু ভয় পেয়ে গেল। গাইড বললেন গাছের পাতা গুলো একদম পায়ে লাগানো যাবেনা, যাক এ যাত্রায় রক্ষে। না, শ্যাম্পু থেরাপি কাজে লাগেনি।

আমরা পানি নিয়েছি তিন বোতল মাত্র, এ নিয়ে লামিয়ার কি রাগ!! আগেই বলেছিলাম পানি নেয়ার জন্য আমি এখন কাউকে পানি দিব না, দাদা আপনিও কাউকে দিবেন না। ফজলে বার বারই বলছে চলে যাবে। না, এত দেখি ঘামে সবাই ভিজে যাচ্ছি গলা শুকিয়ে আসছে বার বার। ঘন্টা না পরুতেই পানি প্রায় শেষের পথে। কিছু খেজুর নিয়েছিলাম সাথে, এগুলো ও প্রায় অর্ধেকটা শেষ।

দেড় ঘন্টা পর মৌ, লামিয়া ও আমার বউ একেবারেই রাজি হচ্ছে না বাকি পথ পারি দিতে। বার বারই বলছে তোমরা যাও আমরা এখানে অপেক্ষা করছি। এ’ও সম্ভব! গেলে সবাই যাব না গেলে যাব না। এদিকে বসাও যাচ্ছে না মশার কামড়ে। তৌহিদ ও ফজলে বার বার মনে সাহস দিচ্ছে ওদের। একবার তো ফজলে রাগ করে বলেই বসলো না ইটস্ টু মাচ্। আমি আগেই বলেছিলাম এমনই হবে, তার পর ও সবাই রাজি হয়েছেন। এ যেন যুদ্ধে এক সৈনিক এর সাথে আরেক সৈনিক এর বাক বিতর্ক। কিছুক্ষন পর আবার যাত্রা।

মৌ এর অবস্থা দেখে একটু ভয়ই পেয়েছিলাম, এমনিতেই ওর কোন ট্রেকিং এর প্রিপারেশান ছিল না, শুধুমাত্র মনের জোড়ে আমাদের সাথে আসা। তাই শারীরিক ভাবে বার বার বিপর্যস্ত হওয়া সত্যেও গন্তব্যে যাওয়ার তীব্র মানষিকতা ওকে আবার অনুপ্রাণিত করছে। এ দিকে মেহজাবিন ও তন্নির কোন ক্লান্তি নেই। গাইডের সাথেই আছে ওরা।

আড়াই ঘন্টা পার হয়ে গেল তারপরও পথ শেষ হচ্ছেনা। একটি টিলায় উঠার আগে গাইড বললেন এখানে কেউ কোন পাতায় টাচ্ করবেনা, যেকোন মূহুর্তে বল্লা কামড় দিতে পারে। খুব সুন সান শব্দ, সবাই খুবই সতর্কতার সাথে ঐ টিলা টি পার হলাম।

ঝরনায় যাওয়ার আগে ঝিরি পথ দিয়ে আঁধা কিলোর মত হাঁটতে হবে। তাই বার বারই ঝিরি পথ কতদূর বাকী গাইড কে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। আর উত্তর একটাই এইতো আর আধা ঘন্টা পর। এক ঘন্টা ধরে একই উত্তর!!

তিন ঘন্টা পর যখন জানলাম আমরা শেষ পাহাড়ের চূড়ায় আছি আর এর নিচে নামলেই ঝিরি পথ সমস্ত ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেল। ঝিরি পথটিতে নেমেই কোন কথা নেই ভিজিয়ে নিলাম সমস্ত শরীর। এ যেন এক দারুণ প্রশান্তি। ঝিরি পথটিও খুব স্বজতনে পা ফেলে এগুচ্ছি, হঠাৎ ছলাৎ ছলাৎ পানির শব্দ কানে এলো দূরে তাকিয়ে নিজেকে বিশ্বাস করাতে কষ্ট হচ্ছে আমরা পৌঁছে গেছি।

ঝরনাটি বর্ষায় পুরো যৌবন পায়।

চিৎকার করে বনের সবাইকে জানালাম আমরা এসেছি আমাদের বরন কর। অনেক অপেক্ষার পর গন্তব্যে পৌঁছানোর আনন্দ বলে বোঝানোর নয়। এ শুধুই নিজের মনে যুদ্ধ জয়ের আনন্দ।

ঝরনার পানিতে নিজেদের বিলিয়ে দিয়ে ঠিক একটার দিকে আবার ফিরতি পথে রওনা দিলাম। ভয় হলো আসতে তিন ঘন্টা লেগেছে যদি ফিরতে একি সময় লাগে কলাবনপাড়া ওখান থেকে আর এক ঘন্টা মাইক্রোতে, নাহ্ সুপ্তির বাসায় যাওয়া তো দূরে থাক ট্রেন মিস না করি। এ ভেবেই এগুচ্ছে সবাই।

না এবার সবার গতিটা একটু বারতিই মনে হচ্ছে।হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আমার থাইয়ে মাসেল পুল হলো। আসলে এ ধরনের ব্যাপারটি আমার জীবনে প্রথম হয়েছে তাই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম তবে ফজলের সেবায় কিছুটা স্বুস্থ বোধ করায় আবার রওনা হলাম। শরীর বেশ ক্লান্ত ও হয়েছে। তবে যখন শেষের সাঁকো টা পার হলাম মনে অন্য রকম এক জেতার আনন্দ বোধ করলাম। এ যেন জীবনের চরম এক এ্যাডভেঞ্চার কাহিনী যুক্ত হলো। নিজেকে আরেক বার ধন্য মনে হলো।

ঠিক সাড়ে তিন টায় বি ডি আর এর অফিসে যখন এলাম কি যে অনুভূতি হয়েছে!! একটু গায়ে পানি দিয়ে আবার মাইক্রোর কাছে চললাম। নাহ্ মাসেল পুলটা আমাকে রক্ষা দিল না, একটি মটর সাইকেল দেখা মাত্র হেল্প চাইলাম। ভদ্রলোকটি আমাকে স্বজতনে মাইক্রোর কাছে পৌঁছে দিলেন।

পাঁচ টা পনেরতে ট্রেন। চারটা বেজে গেল আমাদের মাইক্রোটি রওনা দিতে দিতে। এদিকে আমার বউয়ের বান্ধবী ও তাঁর স্বামী কোন মোবাইল নেট না থাকায় যোগাযোগ করতে পারছেনা, বুঝতে বাকি নেই ওরা আমাদের জন্য কতটা উদগ্রীব হয়ে বসে আছে। বারবার মনে হচ্ছে আসার পথে দেড় ঘন্টা লেগেছিল যাওয়ার পথে পারবে কি এক ঘন্টায়!! নাহ্ গাড়ির গতি ঘন্টায় সর্বচ্চ চল্লিশ, এতবার বলা সত্যও যখন এর উপর গতি উঠছে না, ড্রাইভার তখন বলছেন গাড়িতে সমস্যা হচ্ছে স্পিড উঠছে না। কি করি! নিশ্চিত ট্রেন মিস এবার! তন্নির ফোনে নেট আসা মাত্র বউ তার বান্ধবীকে ফোন দিয়ে বললো খাওয়া দাওয়া প্যাক করে সরাসরি রেল স্টেশনে নিয়ে যাবার জন্য। খুবই কষ্ট মনে ওর রাজি হতে হয় ট্রেন মিস হবে এই ভেবে। একবার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি ট্রেনতো মিস করবই, তো বউয়ের বান্ধবীর বাসায় ফ্রেস হয়ে খেয়ে দেয়ে সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাসে রওনা হবো। তার পর ও মন মানছে না যদি ট্রেন একটু ডিলে করে তবে ট্রেনটি হয়তো ধরতে পরবো। এদিকে ফোন করে খবর নেওয়া হয়ে গেছে ট্রেন সিলেট থেকে সময় মতই ছেড়েছে এবং শ্রীমঙ্গলে ও সময় মত আসবে, এবার কি হবে! আর কোন সম্ভাবনা নেই, হুম নিশ্চিত ফেইল। এত কিছুর পরও মনে ক্ষিন আসা যদি সময় মত যাওয়া যায়! রাস্তায় মাইল স্টোন ও সময় বার বার কেলকুলেসান করছে ফজলে, না কিছুতেই মিলছে না গতি যে সর্বচ্চ “চল্লিশ”।

এদিকে রাস্তার মাঝখানে গরু, হাঁস, মুরগী গুলো যেন কিছুতেই সরে না, গাড়ির গতি একদমই কমে যায় তখন। এ দিকে ওখানের স্কুল গুলো ঐ সময়টাতেই ছুটি হওয়াতে ছাত্র ছাত্রীরা রাস্তায় দল বেঁধে যাওয়ায় গাড়ি ও ধীর গতিতে চলতে হচ্ছে, উহঃ আর মাত্র পনের মিনিট বাকী!! না আর পারা গেল না। একটু পর ড্রাইভার টি একটু আসার কথা শোনালো পাশেই ট্রেন লাইন দেখিয়ে, বললেন মনে হয় ট্রেন আসেনি। আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকী এর মধ্যে ট্রেনটি নিশ্চয়ই দেখা যেত পাশের ট্রেন লাইনে। না, কোন ট্রেন নেই। একটি রেল গেইট পরুলেই স্টেশন, গেটটি ওপেন থাকাতে পার হওয়ার সময় স্টেশনে তাকিয়ে দেখি ট্রেন নেই, মানে আসেনি। চিৎকার করে উঠলাম সবাই,হুররে ট্রেন আসেনি!!!!!!

সুপ্তি ও তাঁর স্বামীকে আমাদের অপারগতার কথা জানিয়ে বিদায় দিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম সেই ঝরনার ভেজা কাপড় নিয়েই। ট্রেন যাচ্ছে সিটে মাথা হেলিয়ে ভাবছি-

কি অপরূপ এই দেশ অথচ একটু আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্য পর্যটনিক কত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গ্রামের সেই দরিদ্র ছোট ছোট বাচ্চা বাঁশের লাঠি বিক্রির মুখ গুলো, করুন চাহনি, আমাদের গাইডকে একটু বারতি টাকা দেওয়ায় নির্মল সেই হাসি, আবার আসবেন বলে বিদায়, যেন বার বার চোখে ভাসছে আর মনে হচ্ছে অনেক বেশি পর্যটক হলে ওদের হয়তো একটু ভাল ভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ হতো।

লেখা ও ছবিঃ ত্রিদিব হালদার